গ্রন্থ , সপ্তম শ্রেণী

 সঠিক উত্তরটি হলো এ) বল্লাল সেন।


বিকল্পগুলির বিস্তারিত বিশ্লেষণ:

  • এ) বল্লাল সেন (সঠিক উত্তর):
    সেন বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক রাজা বল্লাল সেন ছিলেন একজন পরম পণ্ডিত ও সাহিত্য অনুরাগী রাজা। তিনি স্মার্ত সাহিত্য ও আচার-অনুষ্ঠানের ওপর ভিত্তি করে 'দানসাগর' (Danasagara) গ্রন্থটি রচনা করেন। দান সংক্রান্ত নানাবিধ বিধান ও ধর্মীয় আচার এতে বর্ণিত রয়েছে। এছাড়া তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত 'অদ্ভুতসাগর' (Adbhutasagara) গ্রন্থটির কাজ শুরু করেছিলেন, যা তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।

  • বি) লক্ষণ সেন (ভুল উত্তর):
    লক্ষণ সেন ছিলেন বল্লাল সেনের পুত্র। তিনি পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ 'অদ্ভুতসাগর' রচনা সমাপ্ত করেন। লক্ষণ সেন নিজে পণ্ডিত ছিলেন এবং তাঁর রাজসভা জয়দেব, ধোয়ী, শরণ, উমাপতিধর ও গোবর্ধন—এই 'পঞ্চরত্ন' দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। তবে 'দানসাগর' গ্রন্থটি তাঁর রচনা নয়।

  • সি) বিজয় সেন (ভুল উত্তর):
    বিজয় সেন ছিলেন সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এবং বল্লাল সেনের পিতা। তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারে মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন (যার বিবরণ কবি উমাপতিধরের 'দেওপাড়া প্রশস্তি'-তে পাওয়া যায়)। তিনি সামরিক জয় ও সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য বিখ্যাত হলেও 'দানসাগর' গ্রন্থ রচনা করেননি।

  • ডি) হেমন্ত সেন (ভুল উত্তর):
    হেমন্ত সেন ছিলেন সেন বংশের একজন আদি রাজা (সামন্ত সেনের পুত্র)। সেন বংশের রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপনে তাঁর ভূমিকা থাকলেও সাহিত্যিক ক্ষেত্র বা 'দানসাগর' রচনার সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই।



বিবৃতিটি সত্য।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা:

  • কেন এটি সত্য?
    মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট বাবর তাঁর জীবনের ঘটনাবলী, যুদ্ধবিগ্রহ, ভারতের প্রাকৃতিক বিবরণ এবং নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি আত্মজীবনী রচনা করেছিলেন। এই গ্রন্থটির নামই হলো 'তুজুক-ই-বাবরি' (Tuzuk-i-Baburi), যা 'বাবরনামা' (Baburnama) নামেও বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

  • গুরুত্বপূর্ণ আনুষঙ্গিক তথ্য:

    • মূল ভাষা: বাবর এটি তাঁর মাতৃভাষা তুর্কি ভাষায় (চাগতাই তুর্কি) লিখেছিলেন।

    • ফারসি অনুবাদ: পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে তাঁর অন্যতম নবরত্ন আব্দুর রহিম খান-ই-খানা এই আত্মজীবনীটি তুর্কি ভাষা থেকে ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন।

    • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এটি কেবল একটি রাজকীয় আত্মজীবনী নয়, বরং ষোড়শ শতকের মধ্য এশিয়া ও উত্তর ভারতের ইতিহাস, ভূগোল, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের এক অনন্য দলিল।

কলহনের রচিত ‘রাজতরঙ্গিনী’ গ্রন্থ থেকে কাশ্মীরের ইতিহাস জানা যায়।

‘রাজতরঙ্গিনী’ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • রচয়িতা: ১২শ শতকের বিখ্যাত কাশ্মীরি কবি ও ঐতিহাসিক কলহন।

  • বিষয়বস্তু: এটি প্রাচীনকাল থেকে ১২শ শতক পর্যন্ত কাশ্মীরের বিভিন্ন রাজবংশের ধারাবাহিক ইতিহাস।

  • বিশেষত্ব: এটিকে প্রাচীন ভারতের প্রথম যথার্থ ও বিজ্ঞানসম্মত ঐতিহাসিক গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয়।

শিখদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের নাম শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব (বা গুরু গ্রন্থ সাহিব)।

গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য:

  • দশম গুরু ও গ্রন্থ: শিখদের দশম গুরু, গুরু গোবিন্দ সিংহ, এই পবিত্র গ্রন্থটিকে শিখ ধর্মের চিরন্তন ও জীবন্ত 'গুরু' হিসেবে ঘোষণা করেন।

  • সংকলন: এটি মূলতঃ পঞ্চম গুরু, গুরু অর্জন দেব ১৬০৪ সালে 'আদি গ্রন্থ' হিসেবে সংকলন করেন।

  • ভাষা ও লিপি: এটি গুরুমুখী লিপিতে এবং মূলতঃ সান্ত ভাষা (একটি মিশ্র ভাষা) ও পাঞ্জাবি ভাষায় রচিত।

  • বিষয়বস্তু: এতে শিখ গুরুদের পাশাপাশি তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন বিশিষ্ট ভক্তি ও সুফি সন্তদের (যেমন—কবীর, নামদেব, রবিদাস, শেখ ফরিদ প্রমুখ) বাণী ও ভজন সংকলিত রয়েছে।

বিবৃতিটি মিথ্যা।

সঠিক তথ্য:

  • 'রজমনামা' (Razmnama) হলো মহাভারতের ফারসি অনুবাদ।

  • মুঘল সম্রাট আকবরের নির্দেশে ১৫৮২ সালে সংস্কৃত মহাকাব্য মহাভারতকে ফারসি ভাষায় অনুবাদ করা হয় এবং এর নাম দেওয়া হয় 'রজমনামা', যার অর্থ "যুদ্ধের বই" (Book of War)।

  • অনুবাদক দলে নবরত্নের সদস্য ফেজি, আব্দুল কাদির বদায়ুনিসহ বেশ কয়েকজন পণ্ডিত অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

রামায়ণের ফারসি অনুবাদ:

  • সম্রাট আকবরের সময়েই রামায়ণও ফারসি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল, যা মূলত আব্দুল কাদির বদায়ুনি সম্পন্ন করেছিলেন। তবে রামায়ণের অনূদিত রূপটিকে 'রজমনামা' বলা হয় না; রজমনামা কেবল মহাভারতের অনুবাদের নাম।

সঙ্গীত শিরোমণি এবং মানকৌতূহল বই দুটির মধ্যে প্রধান মিলগুলি হলো:

১. বিষয়বস্তু: দুটি গ্রন্থই ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত (Classical Music) বিষয়ক আকর গ্রন্থ। গ্রন্থ দুটিতে বিভিন্ন রাগ, তাল, সঙ্গীত শৈলী এবং ভারতীয় সঙ্গীতের বিভিন্ন তত্ত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।

২. ঐতিহাসিক যুগ: দুটি গ্রন্থই মধ্যযুগে (১৫শ শতক) উত্তর ভারতে রচিত হয়।

৩. ঐতিহাসিক গুরুত্ব: মধ্যযুগে হিন্দু ও ইসলামিক সঙ্গীতরীতির যে অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল, তা সংরক্ষণে এবং উত্তর ভারতীয় হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের বিকাশে দুটি বই-ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

৪. রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা: দুটি গ্রন্থই তৎকালের সঙ্গীত অনুরাগী শাসকদের উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত ও সংকলিত হয়েছিল।

চর্যাপদ মূলত সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের ধর্মীয় সাধনা ও তত্ত্বদর্শনের গান হলেও, এটি পাল আমলের (বিশেষ করে পাল যুগের শেষভাগ ও সেন যুগের প্রারম্ভিক সময়ের) সামাজিক ইতিহাস পুনর্নির্মাণের এক অমূল্য উপাদান। ইতিহাসবিদরা চর্যাপদকে তৎকালীন সমাজজীবনের দর্পণ হিসেবে ব্যবহার করেন, কারণ এর সাধনমার্গের রূপকগুলোর আড়ালে ফুটে উঠেছে সেই সময়ের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার নিখুঁত চিত্র।

চর্যাপদকে সামাজিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে ব্যবহারের প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সাধারণ ও নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাত্রা

চর্যাপদের পদগুলোতে তৎকালীন রাজা-বাদশাহ বা উচ্চবিত্তের বিলাসী জীবনের চেয়ে সাধারণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনধারা বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

  • শবর, ডোম, চণ্ডাল, ব্যাধ, তাঁতি ও জেলেদের দৈনন্দিন জীবিকা, দুঃখ-কষ্ট ও সংগ্রামের কথা এতে উঠে এসেছে।

  • হরিণ শিকার, গাছে ফল পাড়া, তুলা ধোনা, তাঁত বোনা, নৌকা চালানো, মদ তৈরি ও বিক্রির মতো পেশার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা তৎকালীন আর্থ-সামাজিক কাঠামোর স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।

২. তৎকালীন অর্থনৈতিক ও খাদ্য সংকট

চর্যাপদের কবি ভুসুকুপা ও ঢেনঢণপার পদগুলোতে দরিদ্র মানুষের তীব্র অভাব-অনটন ও খাদ্যাভাবের চিত্র ফুটে উঠেছে।

"টালত মোর ঘর নাহি পরৱেশী। হাঁড়ীত ভাত নাহি নিতি আৱেশী॥" (ঢেনঢণপা)

(অর্থ: টিলার ওপর আমার ঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই। হাঁড়িতে ভাত নেই, অথচ নিত্যি অতিথি আসে।)

এই পদের মাধ্যমে পাল আমলের সাধারণ গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের চরম দারিদ্র্য ও অনাহারের বাস্তব ছবি স্পষ্ট হয়।

৩. নারীসমাজ ও পারিবারিক সম্পর্ক

চর্যাপদে তৎকালীন নারীদের অবস্থান, রূপচর্চা, অলঙ্কার ও সামাজিক ভূমিকা প্রকাশিত হয়েছে।

  • ডোম ও শবর নারীদের গহনা পরা (যেমন: কানে কুন্ডল, গলায় কাঁচের মালা), প্রসাধনী ব্যবহার এবং তাঁত বোনার বিবরণ রয়েছে।

  • যৌথ পরিবারের চিত্র, শাশুড়ি-বৌয়ের সম্পর্ক এবং সমাজের বিবাহরীতি বা যৌতুক প্রথার পরোক্ষ উল্লেখ পাওয়া যায়।

৪. নদীমাতৃক রূপ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা

চর্যাপদে নদী, নৌকা, সাঁকো, পারাপারের কড়ি (খেয়া পারাপারের মাশুল) এবং নদী পারাপারের বিপদের প্রচুর রূপক ব্যবহার করা হয়েছে।

  • চাটিল পার পদে কাঠ ও বাঁশের সাঁকো তৈরির কথা রয়েছে।

  • কমলীপার পদে নদীর স্রোত এবং ডোঙ্গা নৌকায় নদী পারাপারের বর্ণনা থেকে বোঝা যায় পাল আমলে নদীপথই ছিল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।

৫. ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বাতাবরণ

চর্যাপদ পাল আমলের ধর্মীয় সহাবস্থান ও তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার ওপর আলোকপাত করে।

  • পাল রাজারা স্বয়ং পরম সৌগত (বৌদ্ধ) হলেও সমাজে ব্রাহ্মণদের প্রাধান্য এবং তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের বিস্তার ঘটেছিল।

  • গান-বাজনা, নাচ, নাটক ও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিনোদনের চিত্র চর্যাপদে পাওয়া যায় (যেমন: বুদ্ধনাটকের উল্লেখ)।

৬. আইন, বিচার ও সামাজিক কুসংস্কার

চর্যাপদে চোর-ডাকাতের ভয়, প্রহরী বা চৌকিদারের টহল এবং অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থার কথা রয়েছে। এছাড়া সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন কুসংস্কার, ভূত-প্রেতের বিশ্বাস এবং বিবাহ-সম্পর্কিত নানা আচার-অনুষ্ঠানের আভাস মেলে।

উপসংহার:

চর্যাপদে তৎকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসের বড় ঘটনা বা রাজাদের নাম পাওয়া না গেলেও, এটি পাল আমলের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, বিশ্বাস ও সামাজিক বৈষম্যের সবচেয়ে খাঁটি ও প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে কাজ করে।

'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' কাব্যের অনুবাদ (রচয়িতা) করেন মালাধর বসু।

(উল্লেখ্য, মালাধর বসু ভাগবত পুরাণের দশম ও একাদশ স্কন্ধের অবলম্বনে 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' কাব্যটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ বা রচনা করেছিলেন। গৌড়ের সুলতান রুকুনুদ্দীন বারবক শাহ তাঁকে 'গুণরাজ খাঁ' উপাধিতে ভূষিত করেন।)

সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত 'রামচরিত' কাব্যের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি দ্ব্যর্থক কাব্য (Double Entendre) — অর্থাৎ, একই শ্লোক ও কাব্য দিয়ে দুটি সম্পূর্ণ আলাদা কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। একাধারে এতে রামায়ণের রামচন্দ্রের কাহিনী এবং অন্যদিকে পাল বংশের রাজা রামপালের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।

মূল মহাকাব্য 'রামায়ণ' এবং সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিত'-এর মধ্যে প্রধান অমিল বা পার্থক্যগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

১. মূল বিষয়বস্তু ও চরিত্র রূপায়ন

  • রামায়ণ: এটি মূলত ত্রেতা যুগের অযোধ্যার রাজকুমার রামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষ্মণের জীবনকাহিনি, রাবণ বধ এবং রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের একটি পৌরাণিক মহাকাব্য।

  • রামচরিত: এটি একাধারে রামায়ণের পৌরাণিক কাহিনী এবং পাল রাজা রামপালের রাজত্বকাল, বরেন্দ্র ভূমি পুনরুদ্ধার ও দিব্য/ভীম-এর নেতৃত্বাধীন কৈবর্ত বিদ্রোহের একটি ঐতিহাসিক দলিল।

২. ভৌগোলিক পটভূমি ও সীতা/বরেন্দ্র রূপক

  • রামায়ণ: রামায়ণের মূল কেন্দ্র ছিল অযোধ্যা এবং লঙ্কা দ্বীপ। সেখানে রামচন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাবণের হাত থেকে তাঁর অপহৃত স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করা।

  • রামচরিত: এখানে রামচন্দ্র হলেন পাল রাজা রামপাল, আর লঙ্কার প্রতীক হলো বরেন্দ্র ভূমি (উত্তরবঙ্গ)। রামপালের প্রধান লক্ষ্য ছিল কৈবর্ত শাসকদের (দিব্য ও ভীম) হাত থেকে তাঁর অপহৃত পিতৃদেবতার রাজ্য 'বরেন্দ্র ভূমি' (সীতারূপী) উদ্ধার করা।

৩. ঐতিহাসিক সত্যতা ও চরিত্র

  • রামায়ণ: এটি একটি পৌরাণিক ও ধর্মীয় মহাকাব্য, যার ঐতিহাসিক প্রমাণের চেয়ে ধর্মীয় ও নীতিগত গুরুত্ব বেশি।

  • রামচরিত: এটি একটি খাঁটি ঐতিহাসিক কাব্য। এতে একাদশ-দ্বাদশ শতকের বাংলার পাল রাজপরিবার, বরেন্দ্র ভূমির ভূগোল এবং তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।

৪. কাব্যের গঠন ও রচনাকৌশল

  • রামায়ণ: মহর্ষি বাল্মীকি সরল ও প্রাঞ্জল অনুষ্টুপ ছন্দে রামায়ণ রচনা করেছিলেন, যা সাধারণ পাঠক বা শ্রোতার কাছে সহজবোধ্য।

  • রামচরিত: এটি অত্যন্ত কঠিন 'শ্লেষ' (Slesha) অলঙ্কারে রচিত। প্রতিটি শ্লোক থেকে একই সাথে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বের করতে হয়, যা বোঝার জন্য উচ্চমানের ব্যাকরণ ও সাহিত্য জ্ঞান প্রয়োজন।

৫. স্থান ও সময়কাল

  • রামায়ণ: প্রাচীন ভারতের সমগ্র উপমহাদেশীয় প্রেক্ষাপটে রচিত পৌরাণিক আখ্যান।

  • রামচরিত: ১২শ শতকের বাংলায় লিখিত এবং মূলত উত্তরবঙ্গ বা বরেন্দ্র অঞ্চলের সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত।

সংক্ষেপে: বাল্মীকির রামায়ণে যেখানে রামচন্দ্র লঙ্কা জয় করে স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করেন, সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে পাল রাজা রামপাল সামন্তদের সাহায্য নিয়ে কৈবর্ত শাসক ভীমকে পরাজিত করে নিজের পিতৃভূমি বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন।

সঠিক উত্তরটি হলো সি) মালাধর বসু।

সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

  • মালাধর বসু (সঠিক উত্তর): ১৫ শতকের শেষভাগে ভাগবত পুরাণের দশম ও একাদশ স্কন্ধের অনুবাদ করে তিনি ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্যটি রচনা করেন। গৌড়ের সুলতান রুকুনুদ্দীন বারবক শাহ তাঁকে ‘গুণরাজ খাঁ’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

  • কাশীরাম দাস: তিনি মহাভারতের বিখ্যাত বাংলা অনুবাদক।

  • কৃত্তিবাস ওঝা: তিনি শ্রীরামায়ণের বাংলা অনুবাদক (কৃত্তিবাসী রামায়ণ)।

সঠিক উত্তরটি হলো বি) জায়োসি (মূল কাব্যের ক্ষেত্রে) অথবা সি) আলাওল (বাংলা কাব্যের ক্ষেত্রে)।

প্রশ্নটির উত্তর প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে:

  • আলাওল (সি): মধ্যযুগের বিখ্যাত বাঙালি কবি আলাওল ১৬৫১ খ্রিস্টাব্দে মালিক মুহম্মদ জায়সির মূল আউধি কাব্য অনুসরণ করে বাংলায় 'পদ্মাবতী' কাব্যটি রচনা করেন। বাঙালি পাঠকদের জন্য বা বাংলা সাহিত্যের পরীক্ষায় সাধারণত আলাওল-কেই উত্তর হিসেবে ধরা হয়।

  • জায়োসি (বি): ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে মূল 'পদ্মাবৎ' (Padmavat) কাব্যটি সুফি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সি (Malik Muhammad Jayasi) আউধি (হিন্দি) ভাষায় রচনা করেছিলেন।

বিকল্পগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

  • ফৈজি (এ): ইনি মুঘল সম্রাট আকবরের রাজসভার অন্যতম নবরত্ন ও কবি ছিলেন, যিনি মহাভারতের অনুবাদসহ নানা ফারসি সাহিত্য রচনা করেছিলেন।

‘আল রিহলা’ (Al Rihla) বিখ্যাত মরোক্কান পরিব্রাজক ও পর্যটক ইবন বতুতা-র (Ibn Battuta) লেখা ভ্রমণবৃত্তান্ত।

‘আল রিহলা’ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • সম্পূর্ণ নাম: এই গ্রন্থটির মূল নাম ‘তুহফাতুন নুজ্জার ফি গরাইবিল আমসার ও অজাইবিল আসফার’ (Tuhfat an-Nuzzar in Crimes of Cities and Wonders of Travel), যা সংক্ষেপে 'রিহলা' বা 'আল রিহলা' নামে পরিচিত।

  • অনুতোর্য ভূমিকা: ইবন বতুতা প্রায় ৩০ বছর ধরে বিশ্ব ভ্রমণ করে তাঁর অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন। তিনি তৎকালীন মরক্কোর সুলতান আবু ইনান ফারিসের আদেশে গ্রন্থকার ইবন জুজাই (Ibn Juzayy)-কে তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা মুখে মুখে বলেন এবং ইবন জুজাই তা লিপিবদ্ধ করেন।

  • ভারতে আগমন: চতুর্দশ শতকে মুঘল যুগের পূর্বে, সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে (১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে) ইবন বতুতা ভারতে আসেন।

  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এই গ্রন্থে তৎকালীন মধ্য এশিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বিশেষ করে বাংলার (সোনারগাঁও ও সিলেট) আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ধর্মীয় পরিবেশ ও সুলতানি আমলের রাজনীতির এক অমূল্য দলিল পাওয়া যায়।

হস্তলিপি বিদ্যাকে ইংরেজিতে Palaeography (পালিওগ্রাফি - প্রাচীন বা ঐতিহাসিক হস্তলিপি পাঠোদ্ধার বিদ্যা) বা Calligraphy (ক্যালিগ্রাফি - সুন্দর হস্তলিপি শিল্প) বলা হয়।

তবে ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক দিক থেকে প্রাচীন হস্তলিপি বা লিপির পাঠোদ্ধার সংক্রান্ত পাঠকে Palaeography (বা Paleography) বলা হয়।


সিদ্ধাচার্য হলেন সহজযান ও বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের (বিশেষ করে চর্যাপদের যুগে) সেই সকল মহাসিদ্ধ বা সিদ্ধসাধক, যাঁরা কঠোর সাধনা ও ধ্যানের মাধ্যমে পরম জ্ঞান বা 'সিদ্ধি' লাভ করেছিলেন।

সিদ্ধাচার্যদের মূল বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়:

১. চর্যাপদের রচয়িতা:

অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে বাংলায় পাল ও সেন আমলে যেসব ৮৪ জন মহাসিদ্ধের কথা জানা যায়, তাঁদের মধ্যে মূলত ২৩-২৪ জন সিদ্ধাচার্য ৪৬টি পূর্ণাঙ্গ চর্যাপদ রচনা করেছিলেন।

২. প্রধান সিদ্ধাচার্যগণ:

  • লুইপা: তাঁকে চর্যাপদের আদি সিদ্ধাচার্য বা প্রথম পদকর্তা হিসেবে গণ্য করা হয়।

  • কাহ্নপা: তিনি সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পদ (১৩টি) রচনা করেছেন।

  • ভুসুকুপা: তিনি নিজেকে 'বাঙালি' হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন এবং ৮টি পদ রচনা করেছেন।

  • অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নাম: শবরপা, সরহপা, কুক্কুরীপা, ডোম্বীপা, মীনপা, শান্তিপা প্রমুখ।

৩. সাধনমার্গ ও জীবনদর্শন:

  • তাঁরা ছিলেন মূলত গুরুবাদী। গুরুর দেখানো পথেই গূঢ় তত্ত্ব সাধনার মাধ্যমে নির্বাণ বা মহাসুখ লাভ সম্ভব—এটিই ছিল তাঁদের মূল বিশ্বাস।

  • তৎকালীন সমাজে ব্রাহ্মণভিত্তিক বর্ণপ্রথা, বৈষম্য এবং বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানকে প্রত্যাখ্যান করে তাঁরা অন্তরের শুচিতা ও স্বাভাবিক রূপকে (সহজ পথ) প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

৪. সামাজিক অবস্থান:

অধিকাংশ সিদ্ধাচার্যই সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গ (যেমন: শবর, ডোম, তাঁতি, জেলে) থেকে উঠে এসেছিলেন। তাই তাঁদের রচিত পদে তৎকালীন সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের জীবনচিত্র রূপকের অন্তরালে ফুটে উঠেছে।

চর্যাপদ হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন এবং আদি রূপের একমাত্র নির্ভরযোগ্য আকর গ্রন্থ।

১. আবিষ্কার ও প্রকাশনা

  • আবিষ্কার: ১৯০৭ সালে পণ্ডিত মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার (রয়েল লাইব্রেরি) থেকে চর্যাপদের তালপাতার পুঁথিটি আবিষ্কার করেন।

  • প্রকাশনা: ১৯১৬ সালে (১৩২৩ বঙ্গাব্দ) কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোহা' নামে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

২. নামকরণ ও বিষয়বস্তু

  • হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপাল থেকে প্রাপ্ত পুঁথির নাম দিয়েছিলেন 'চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়'।

  • মূলতঃ এটি বজ্রযান ও সহজযান পন্থী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের রচিত সাধনা ও ধর্মীয় তত্ত্বদর্শনের গান।

  • মোট পদে ৪৬টি পূর্ণাঙ্গ এবং ১টি খণ্ডিত পদ (২৪ নম্বর পদ) পাওয়া গেছে। মূল পুঁথিতে ৫০টি (মতান্তরে ৫১টি) পদ ছিল, যার কয়েকখানি পাতা নষ্ট হয়ে যায়।

৩. ভাষা ও লিপি

  • সন্ধ্যা ভাষা (বা আলো-আঁধারি ভাষা): চর্যাপদের ভাষাকে 'সন্ধ্যা ভাষা' বলা হয়, কারণ এর বাহ্যিক অর্থ একরকম এবং গূঢ় সাধনার অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

  • ভাষাতাত্ত্বিক গুরুত্ব: ১৯২৬ সালে ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'The Origin and Development of the Bengali Language' (ODBL) গ্রন্থে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিত করেন যে চর্যাপদের ভাষা প্রাচীন বাংলা। পরবর্তীতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌সহ অন্যান্য পণ্ডিতগণও এটি সমর্থন করেন।

৪. প্রধান পদকর্তা ও সিদ্ধাচার্যগণ

চর্যাপদের পদকর্তাদের সিদ্ধাচার্য বলা হয়। মোট ২৩ বা ২৪ জন পদকর্তার নাম পাওয়া যায়:

  • লুইপা: চর্যাপদের প্রথম পদটির রচয়িতা (আদি সিদ্ধাচার্য)।

  • কাহ্নপা: সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পদ (১৩টি) রচনা করেছেন।

  • ভুসুকুপা: তিনি ৮টি পদ রচনা করেন এবং নিজেকে 'বাঙালি' বলে দাবি করেছেন ("আজি ভুসুকু বাঙ্গালী ভইলী")।

  • অন্যান্য: শবরপা, কুক্কুরীপা, ডোম্বীপা, সরহপা প্রমুখ।

৫. ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব

চর্যাপদ কেবল ধর্মীয় গানের সংকলন নয়, এটি পাল ও সেন আমলের বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান দলিল।

  • এতে তৎকালীন নিম্নবর্গের মানুষ (ডোম, শবর, চণ্ডাল, তাঁতি, জেলে) এবং তাঁদের জীবিকা, অভাব-অনটন ও দৈনন্দিন জীবনের ছবি ফুটে উঠেছে।

  • তৎকালীন নদীমাতৃক রূপ, নৌকা পারাপারের কড়ি, খাদ্য (হাঁড়িতে ভাত না থাকা), নাচ-গান ও আচার-অনুষ্ঠানের বর্ণনা এতে পাওয়া যায়।

মিথ্যা।

কারণ:

চর্যাপদের মাধ্যমে সংস্কৃত ভাষার বিকাশ ঘটেনি; বরং এটি বাংলা ভাষার প্রাচীনতম রূপের (প্রাচীন বাংলা) বিকাশ ও লিখিত নিদর্শনের সূচনা করেছিল।

চর্যাপদের কবিরা (সিদ্ধাচার্যগণ) তখনকার অভিজাত শ্রেণীর ভাষা সংস্কৃতকে প্রত্যাখ্যান করে সাধারণ মানুষের কথ্য ও বোধগম্য প্রাাকৃত/অপভ্রংশ থেকে উদ্ভূত প্রাচীন বাংলা ভাষায় তাঁদের পদগুলো রচনা করেছিলেন। তাই চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন বলা হয়, সংস্কৃত সাহিত্যের নয়।

পাঁচালী এবং পদাবলী—দুটিই মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ধারা। নিচে দুটির সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো:

১. পাঁচালী সাহিত্য

সংজ্ঞা:

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে সাধারণত নির্দিষ্ট ছন্দ (মূলত পয়ার ও ত্রিপদী) ও সুরে গাওয়া দীর্ঘ আখ্যানকাব্য বা দেব-দেবীর মাহাত্ম্যসূচক কাব্যকে পাঁচালী বলা হয়। 'পাঁচালী' শব্দটি মূলত 'পঞ্চালী' বা 'পাঁচ চিত্র/অঙ্গ' থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়।

প্রধান বৈশিষ্ট্য ও বিবরণ:

  • বিষয়বস্তু: পাঁচালী মূলত দেব-দেবীর পূজা, ব্রতকথা, মাহাত্ম্য প্রচার এবং পৌরাণিক আখ্যানকে কেন্দ্র করে রচিত হতো।

  • পরিবেশন রীতি: পাঁচালী সাধারণত একজন মূল গায়ক (পাঁচালীকার) ও তাঁর দোহারদের (সহগায়ক) দ্বারা গান, নাচ ও ছন্দের মাধ্যমে আসরে পরিবেশন করা হতো।

  • উদাহরণ: মঙ্গলকাব্য (যেমন—মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল), রামায়ণ-মহাভারতের বাংলা অনুবাদ (যেমন—কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কাশীরাম দাসের মহাভারত) এবং সত্যনারায়ণের পাঁচালী বা ব্রতকথাগুলো পাঁচালী সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত।

২. পদাবলী সাহিত্য

সংজ্ঞা:

কোনো নির্দিষ্ট ভাব বা অনুভূতিকে কেন্দ্র করে রচিত সংক্ষিপ্ত, সুরময় ও গীতিময় কবিতা বা গানকে 'পদ' বলা হয় এবং এই পদসমূহের সংকলিত সাহিত্য রূপকে পদাবলী সাহিত্য বলে। বাংলা সাহিত্যে পদাবলী বলতে মূলত বৈষ্ণব পদাবলী (রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা ও গৌরচন্দ্রিকা সম্পর্কিত গান)-কেই বোঝানো হয়।

প্রধান বৈশিষ্ট্য ও বিবরণ:

  • বিষয়বস্তু: এটি প্রধানত প্রেম, ভক্তি, বিরহ ও মিলনের আখ্যান। রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলা এবং চৈতন্যদেবের জীবনের ভাবাবেগকে কেন্দ্র করে পদাবলী রচিত হয়েছে।

  • ভাষা: বৈষ্ণব পদাবলী প্রধানত ব্রজবুলি (বাংলা ও মৈথিলীর মিশ্রণে তৈরি একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা) এবং প্রাচীন/মধ্যযুগীয় বাংলায় রচিত।

  • প্রধান পদকর্তাগণ: বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বলরামদাস প্রমুখ ছিলেন পদাবলী সাহিত্যের বিখ্যাত পদকর্তা।

  • শ্রেণীবিভাগ: পদাবলী সাহিত্যকে কতগুলো পর্যায়ে ভাগ করা হয়; যেমন—পূর্বরাগ, অনুরাগ, রূপানুরাগ, প্রেমবৈচিত্র্য, বিরহ, মাথুর এবং গৌরচন্দ্রিকা।

সংক্ষেপে মূল পার্থক্য:

  • পাঁচালী হলো আখ্যানমূলক বা গল্পপ্রধান দীর্ঘ কাব্য (Story-oriented narrative poem)।

  • পদাবলী হলো ভাবপ্রধান ও অনুভূতিমূলক গীতিকবিতা (Emotion-oriented lyric poetry)।

সঠিক উত্তরটি হলো ডি) গুরুমুখী (বা গুরুমুখী লিপি/ভাষা)।

সংক্ষিপ্ত তথ্য:

  • গুরুমুখী (Gurmukhi): গুরু গ্রন্থ সাহিব মূলত গুরুমুখী লিপিতে লিখিত। এর ভাষা মূলত একটি মিশ্র রূপ—যাকে 'সান্ত ভাষা' (Santi Bhasha) বা সাধু ভাষা বলা হয়। এতে প্রাচীন পাঞ্জাবি, অপভ্রংশ, হিন্দি, ব্রজবুলি, সংস্কৃত, ফারসি এবং আরবি শব্দের মিশ্রণ রয়েছে।

  • সংকলন: ১৬০৪ সালে পঞ্চম শিখ গুরু, গুরু অর্জন দেব প্রথম এটি সংকলন করেছিলেন (তখন নাম ছিল 'আদি গ্রন্থ')। পরবর্তীতে ১৭০৮ সালে দশম গুরু, গুরু গোবিন্দ সিংহ এটিকে শিখদের চিরন্তন ও জীবন্ত 'গুরু' হিসেবে মর্যাদা দেন।
সঠিক উত্তরটি হলো রজমনামা।

সংক্ষিপ্ত তথ্য:

  • রজমনামা (Razmnama): ফারসি ভাষায় 'রজম' (Razm) শব্দের অর্থ 'যুদ্ধ' এবং 'নামা' (Nama) শব্দের অর্থ 'কাহিনি' বা 'বই'। অর্থাৎ 'রজমনামা' শব্দের অর্থ হলো 'যুদ্ধের বই'। মুঘল সম্রাট আকবরের আদেশে ফৈজি, আব্দুল কাদির বাদাউনি এবং অন্যান্য পণ্ডিতগণ মহাভারতের মূল সংস্কৃত থেকে ফারসি ভাষায় এই চমৎকার অনুবাদটি সম্পন্ন করেছিলেন।

অন্যান্য বিকল্পগুলির পরিচয়:

  • হামজানামা: এটি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পিতৃব্য আমীর হামজার বীরত্বগাথা ও কাল্পনিক দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতার চিত্রে ভরা একটি ফারসি গল্পসংগ্রহ।

  • তুতিনামা: এটি 'একটি তোতাপাখির ৭২টি গল্প' নিয়ে রচিত একটি বিখ্যাত ফারসি গল্পগ্রন্থ।

সঠিক উত্তরটি হলো সি) ফারসি।

সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

  • ফারসি সাহিত্যিক (প্রধান মাধ্যম): আমির খসরু মূলত ফারসি ভাষার একজন মহাকবি ও সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি সুলতানি আমলে দিল্লি সালতানাতের রাজসভার (বলবন থেকে শুরু করে গিয়াসউদ্দিন তুঘলক পর্যন্ত) কবি ছিলেন। তাঁর অধিকাংশ বিখ্যাত গ্রন্থ ও কাব্য ফারসি ভাষাতেই রচিত।

  • হিন্দভি ও ফারসির মিশ্রণ: ফারসি তাঁর প্রধান সাহিত্যিক ভাষা হলেও, তিনি মধ্যযুগীয় ভারতীয় ভাষা 'হিন্দভি' (উর্দু ও হিন্দির প্রাথমিক রূপ)-তেও কবিতা, পহেলি (ধাঁধা) ও গজল রচনা করেছিলেন। তাঁকেই উর্দু সাহিত্যের আদি গুরু বা জনক বলা হয়, তবে ঐতিহাসিক ও সাহিত্যের ব্যাকরণগত বিচারে তিনি ফারসি কবি হিসেবেই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।

আকবরনামা (Akbarnama) হলো মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের সরকারি ও আনুষ্ঠানিক ইতিহাসগ্রন্থ।

এর মূল বিষয়বস্তু ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • রচয়িতা: মুঘল সম্রাট আকবরের রাজসভার নবরত্নের অন্যতম, বিখ্যাত আবুল ফজল (Abul Fazl)।

  • ভাষা: মূল গ্রন্থটি ফারসি ভাষায় রচিত।

  • খণ্ড বা ভাগ: আকবরনামা মূলত তিনটি খণ্ডে বিভক্ত:

    1. প্রথম খণ্ড: আকবরের পূর্বপুরুষদের ইতিহাস (তৈমুর লং থেকে শুরু করে বাবুর ও হুমায়ুন) এবং আকবরের জন্ম ও বাল্যকালের বিবরণ।

    2. দ্বিতীয় খণ্ড: আকবরের রাজত্বকালের ৪৬তম বছর (১৬০২ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত বিস্তারিত রাজনৈতিক ও সামরিক ইতিহাস।

    3. তৃতীয় খণ্ড: এই অংশটি 'আইন-ই-আকবরী' (Ain-i-Akbari) নামে আলাদাভাবে সুপরিচিত। এতে আকবরের শাসনব্যবস্থা, রাজস্ব নীতি, সেনাবাহিনী, প্রশাসনিক বিভাগ এবং ভারতের তৎকালীন ভৌগোলিক ও সামাজিক জীবনের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
এটি মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে এক অনন্য দলিল, যা তৎকালীন মুঘল ভারতের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জানার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

সেন বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নরপতি বল্লাল সেন (দ্বাদশ শতক) কেবল একজন শাসকই ছিলেন না, তিনি নিজে একাধারে বিদ্যানুরাগী, পণ্ডি‍ত ও প্রখ্যাত সংস্কৃত সাহিত্যিক ছিলেন।

তাঁর রচিত প্রধান গ্রন্থগুলি হলো:

১. দানসাগর (Danasagara)

  • বিষয়বস্তু: এটি একটি স্মৃতিশাস্ত্র বা বিধান গ্রন্থ।

  • বিবরণ: এতে দান করার নানা ধর্মীয় নিয়ম-কানুন, দানের পদ্ধতি, উপযুক্ত পাত্র, শুভ সময় এবং বিভিন্ন প্রকার দানের ফল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

২. অদ্ভুতসাগর (Adbhutasagara)

  • বিষয়বস্তু: এটি মূলত জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং জ্যোতিষশাস্ত্র সংক্রান্ত একটি আকর গ্রন্থ।

  • বিবরণ: উৎপাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, গ্রহণ, ধূমকেতু এবং গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের শুভ-অশুভ ফল ও তার প্রতিকার নিয়ে এতে আলোচনা রয়েছে।

  • বিশেষ তথ্য: বল্লাল সেন এই গ্রন্থটির রচনা শুরু করেছিলেন, কিন্তু এটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারেননি। পরবর্তীতে তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন কাব্যটি সমাপ্ত করেন।

অন্যান্য গ্রন্থ (যা তাঁর রচিত বলে প্রচলিত):

  • প্রতিষ্ঠাসাগর (Pratishthasagara): মন্দির, মূর্তি বা দীঘি-জলাশয় প্রতিষ্ঠার নিয়মাবলী সম্পর্কিত এই গ্রন্থটি বল্লাল সেনের রচিত বলে কিছু কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন।

  • আচারসাগর (Acharasagara): হিন্দু সমাজের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান ও বৈদিক কৃতি সংক্রান্ত এই গ্রন্থটির রচয়িতা হিসেবেও তাঁর নাম উল্লেখ পাওয়া যায়।

(উল্লেখ্য: কুলীন প্রথার প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত বল্লাল সেন মূলত 'দানসাগর' এবং 'অদ্ভুতসাগর'—এই দুটি বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থের জন্যই বাংলা ও ভারতীয় সাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন।)

সেন বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা লক্ষণ সেন (রাজত্বকাল: আনু. ১১৭৯–১২০৬ খ্রিষ্টাব্দ) কেবল একজন পরাক্রান্ত শাসকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন পরম বিদ্যানুরাগী ও কবি- সাহিত্যিকদের মহান পৃষ্ঠপোষক। তাঁর সময়কালকে সংস্কৃত বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

লক্ষণ সেনের রাজসভায় সাহিত্যচর্চার সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে তুলে ধরা হলো:

১. রাজসভার পঞ্চরত্ন (Five Gems)

রাজা লক্ষণ সেনের রাজসভা অলঙ্কৃত করেছিলেন পাঁচজন প্রখ্যাত সংস্কৃত কবি, যাঁদের একত্রে 'পঞ্চরত্ন' বলা হয়:

  1. জয়দেব: রাজসভার শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর অমর সৃষ্টি 'গীতগোবিন্দম্' (Gita Govinda)। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে রচিত এই গীতিকাব্যটি মধুর কোমলকান্ত পদাবলীর জন্য বিশ্বসাহিত্যে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে।

  2. ধোয়ী: তাঁর বিখ্যাত কাব্য 'পবনদূত' (Pavanaduta)। মহাকবি কালিদাসের 'মেঘদূত'-এর অনুকরণে রচিত এই কাব্যে কুহুমপুর (গৌড়)-এর সৌন্দর্য এবং দক্ষিণ হাওয়ার মাধ্যমে বিরহ বার্তার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

  3. উমাপতি ধর: তিনি ছিলেন অসাধারণ অলঙ্কার সমৃদ্ধ কাব্যের রচয়িতা। তাঁর বিখ্যাত রচনা 'চন্দ্রচূড়চরিত'।

  4. গোবর্ধন আচার্য: তাঁর বিখ্যাত মুক্তক কাব্য 'আর্যা সপ্তশতী' (Arya Saptashati)। এতে ৭০০টি আর্যা ছন্দে প্রেম, শৃঙ্গার ও তৎকালীন গ্রামীণ জীবনের বাস্তব ছবি ফুটে উঠেছে।

  5. শরণ: ইনি দ্রুত কবিতা রচনায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন (আশু কবি)। তবে তাঁর কোনো স্বতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ কাব্য আজ পাওয়া যায় না, কিছু বিচ্ছিন্ন শ্লোক সংকলিত রয়েছে।

২. স্মৃতিশাস্ত্র ও কোষগ্রন্থ প্রণয়ন

কেবল কাব্য-কবিতা নয়, রাজসভার ধর্মীয় ও সামাজিক বিধান এবং অভিধান চর্চাতেও বিশেষ অগ্রগতি ঘটেছিল:

  • হলায়ুধ: লক্ষণ সেনের রাজসভার প্রধান ধর্মাধ্যক্ষ ও মহামন্ত্রী হলায়ুধ রচনা করেন বিখ্যাত স্মৃতিগ্রন্থ 'ব্রাহ্মণসর্বস্ব'। এতে বৈদিক সূক্ত ও আচার-অনুষ্ঠানের বিবরণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনি 'কবি রহস্য' নামে একটি গ্রন্থও লেখেন।

  • শ্রীধর দাস: লক্ষণ সেনের মহাসামন্ত শ্রীধর দাস ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে রচনা করেন বিখ্যাত কাব্য-সংকলন 'সদুক্তি-কর্ণামৃত' (Sadukti-Karnamrita)। এতে লক্ষণ সেন ও তাঁর রাজসভার কবিদের সহ তৎকালীন বাংলার বহু কবির ৪৮৫টি কবিতা/শ্লোক সংকলিত হয়।

৩. লক্ষণ সেনের নিজস্ব সাহিত্যসাধনা

লক্ষণ সেন কেবল পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকই ছিলেন না, তিনি নিজেও একজন সুকvol এবং পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন।

  • পিতৃদেব বল্লাল সেন কর্তৃক অসমাপ্ত রাখা জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থ 'অদ্ভুতসাগর' (Adbhutasagara) তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেন।

  • এছাড়া তাঁর রচিত বেশ কিছু সুন্দর সংস্কৃত শ্লোক 'সদুক্তি-কর্ণামৃত' গ্রন্থে সংকলিত রয়েছে।

সারসংক্ষেপ

লক্ষণ সেনের রাজসভা ছিল মধ্যযুগীয় পূর্ব ভারতের সংস্কৃত সাহিত্য চর্চার প্রধান কেন্দ্র। বৈষ্ণব ভাবাশ্রিত রসাশ্রয়ী কাব্য, স্মৃতিশাস্ত্র এবং কাব্য সংকলন—সব মিলিয়ে তাঁর রাজত্বকাল প্রাচীন বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

সঠিক উত্তরটি হলো বি) বৌদ্ধ গ্রন্থ।

সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

  • গ্রন্থের ধরন: 'আর্য মঞ্জুশ্রী মূলকল্প' (Arya Manjushri Mula Kalpa) মূলত মহাযান ও বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃত গ্রন্থ (মহাযান সূত্র/তন্ত্র)।

  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতের, বিশেষ করে গুপ্ত সাম্রাজ্য, মৌর্য আমল এবং বাংলা ও বিহারের (পাল বংশের পূর্বের) ইতিহাস জানার জন্য এটি একটি অমূল্য উপাদান। এতে বিভিন্ন রাজাদের সংক্ষিপ্ত রূপক ইতিহাস ও তালিকা পাওয়া যায়।

সঠিক উত্তরটি হলো সি) চক্রপাণি দত্ত।

সংক্ষিপ্ত তথ্য:

  • চক্রপাণি দত্ত (Chakrapani Datta): একাদশ শতকের বিখ্যাত বাঙালি চিকিৎসা-বিজ্ঞানী, আয়ুর্বেদ বিশারদ ও সংস্কৃত পণ্ডিত ছিলেন।

  • চিকিৎসা সংগ্রহ (Chikitsa Samgraha): তাঁর অন্যতম প্রধান ও সর্বশ্রেষ্ঠ রচনার মূল নাম ছিল 'চিকিৎসা সংগ্রহ'। গ্রন্থটির ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং রচয়িতার নামের খ্যাতির কারণে এটি পরবর্তীতে 'চক্রদত্ত' নামে পরিচিত লাভ করে।

  • অন্যান্য অবদান: তিনি চরক সংহিতার বিখ্যাত টিকাকাব্য 'আয়ুর্বেদ দীপিকা' এবং সুশ্রুত সংহিতার টীকা 'ভানুমতী' রচনা করেন। এছাড়া তাঁর রচিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো 'দ্রব্যগুণ সংগ্রহ'।

পূর্বের প্রশ্নের বাকি দুজন ব্যক্তিত্ব—চরক এবং সুশ্রুত—প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের দুই মহান স্তম্ভ। তাঁদের সংক্ষেপ পরিচয় ও প্রধান গ্রন্থসমূহ নিচে দেওয়া হলো:

এ. চরক (Charaka)

  • প্রধান গ্রন্থ: ‘চরক সংহিতা’ (Charaka Samhita)।

  • অবদান: তিনি প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদ ও আয়ুর্বেদ বিশারদ ছিলেন। তাঁর রচিত ‘চরক সংহিতা’ আয়ুর্বেদ চিকিৎসাবিজ্ঞানের (বিশেষ করে কায়চিকিৎসা বা Internal Medicine) সবচেয়ে প্রাচীন ও মৌলিক আকর গ্রন্থ।

  • পরিচয়: তাঁকে 'প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক' হিসেবে গণ্য করা হয়।

বি. সুশ্রুত (Sushruta)

  • প্রধান গ্রন্থ: ‘সুশ্রুত সংহিতা’ (Sushruta Samhita)।

  • অবদান: তিনি ছিলেন প্রাচীন ভারতের শ্রেষ্ঠ শল্যচিকিৎসক বা সার্জন (Surgeon)। তাঁর গ্রন্থটি মূলত শল্যচিকিৎসা (অস্ত্রোপচার/Surgery) ও চোখ-কান-গলার চিকিৎসা সংক্রান্ত বিষয়ের উপর রচিত।

  • পরিচয়: তাঁকে 'ভারতীয় শল্যচিকিৎসার (অস্ত্রোপচারের) জনক' এবং বিশ্বের প্লাস্টিক সার্জারির আদি পুরুষ বলা হয়। সুশ্রুত সংহিতায় ১২০টিরও বেশি শল্য-যন্ত্রপাতি (Surgical instruments) এবং বিভিন্ন জটিল অস্ত্রোপচারের বিবরণ রয়েছে।

সঠিক উত্তরটি হলো এ) পাল যুগের চিকিৎসা বিজ্ঞানী।

সংক্ষিপ্ত তথ্য:

  • যুগ ও সময়কাল: চক্রপাণি দত্ত ছিলেন একাদশ শতকের (প্রায় ১০৪০ খ্রিষ্টাব্দ) এক বিখ্যাত বাঙালি চিকিৎসাবিদ। তিনি পাল সাম্রাজ্যের রাজা নয়পাল (Nayapala) এবং বিগ্রহপাল (তৃতীয়)-এর সমসাময়িক ছিলেন।

  • পরিচয়: তাঁর পিতা নারায়ণ দত্ত ছিলেন পাল রাজাদের রান্নাঘরের প্রধান কর্মকর্তা (রসObjectType/রসোয়্যাধ্যক্ষ)।

  • স্থান: তাঁর জন্ম হয়েছিল বীরভূম জেলার ময়ূরেশ্বর গ্রামে। পাল আমলে ভারতীয় আয়ুর্বেদ চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমৃদ্ধিতে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়।

গৌড়রাজ শশাঙ্ককে প্রধানত দুটি বিখ্যাত সমসাময়িক উৎসে বৌদ্ধবিদ্বেষী ও বৌদ্ধধর্মের উৎপীড়ক হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে:

১. হিউয়েন সাঙের ভ্রমণবৃত্তান্ত ('সি-ইউ-কী')

চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ (Hiuen Tsang) তাঁর ভারত ভ্রমণবৃত্তান্ত 'সি-ইউ-কী' (Si-Yu-Ki)-তে শশাঙ্ককে চরম বৌদ্ধবিদ্বেষী রাজা হিসেবে তুলে ধরেছেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন যে শশাঙ্ক:

  • বুদ্ধগয়ার পবিত্র বোধিবৃক্ষ উপড়ে ফেলে তা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার এবং মূল নদীতে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

  • কুশীনগরের বুদ্ধমূর্তি সরিয়ে ফেলার এবং পাটলিপুত্রের বুদ্ধের পদচিহ্ন অঙ্কিত পাথরটি গঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন।

  • বিহার ও বাংলার বহু বৌদ্ধ মঠ ধ্বংস করেছিলেন এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের বিতাড়িত ও হত্যা করেছিলেন।

২. বাণভট্টের 'হর্ষচরিত'

কনৌজের রাজা হর্ষবর্ধনের রাজকবি বাণভট্ট তাঁর রচিত চরিতকাব্য 'হর্ষচরিত'-এ শশাঙ্ককে "গৌড়ভুজঙ্গ" (গৌড়ের বিষধর সাপের মতো) এবং "গৌড়াধম" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে শশাঙ্ক হর্ষবর্ধনের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাজ্যবর্ধনকে প্রতারণা করে হত্যা করেছিলেন এবং বৌদ্ধধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন।

৩. 'আ্য মঞ্জুশ্রী মূলকল্প'

মহাযান বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ 'আর্য মঞ্জুশ্রী মূলকল্প' (Arya Manjushri Mula Kalpa)-তেও শশাঙ্কের নাম সরাসরি না বলে 'সোম' (চন্দ্র-গোত্রীয়) নামে একজন গৌড়রাজের উল্লেখ পাওয়া যায়, যিনি বৌদ্ধ ধর্মস্থান ও মঠ ধ্বংস করেছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি (আধুনিক বিশ্লেষণ):

রমেশচন্দ্র মজুমদার, শৈলেন্দ্রনাথ সেনসহ আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, এই বিবরণগুলোতে অনেকখানি পক্ষপাতিত্ব ও অতিরঞ্জন রয়েছে। বাণভট্ট ছিলেন শশাঙ্কের চরম শত্রু হর্ষবর্ধনের সভাকবি এবং হিউয়েন সাঙ ছিলেন হর্ষবর্ধনের পরম অনুরাগী ও বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। তাই হিন্দুধর্মের (শৈবধর্মের) পৃষ্ঠপোষক শশাঙ্কের বিরুদ্ধে এই অভিযোগগুলোর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে সমকালীন এই গ্রন্থগুলোতেই মূলত তাঁকে 'বৌদ্ধবিদ্বেষী' হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।


সঠিক উত্তরটি হলো সি) বাকপতিরাজ।

সংক্ষিপ্ত তথ্য:

  • কাব্য ও বিষয়বস্তু: 'গৌড়বহ' (Gaudavaho) বা 'গৌড়বধ' হলো প্রাাকৃত ভাষায় রচিত একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক আখ্যানকাব্য। এতে কনৌজের প্রখ্যাত রাজা যশোবর্মণ কর্তৃক বাংলার (গৌড়ের) রাজাকে পরাজিত ও হত্যা করার ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।

  • রচয়িতা: বাকপতিরাজ (Vakpatiraja) ছিলেন রাজা যশোবর্মণের রাজসভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।

অন্যান্য বিকল্পগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয়:

  • কলহন: কাশ্মীরের বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ 'রাজতরঙ্গিণী'-র রচয়িতা।

  • বাণভট্ট: সম্রাট হর্ষবর্ধনের সভাকবি; তিনি 'হর্ষচরিত' এবং 'কাদম্বরী' রচনা করেন।

  • লক্ষণ সেন: সেন বংশের রাজা; তিনি সাহিত্য অনুরাগী ছিলেন এবং তাঁর পুত্র বল্লাল সেনের অসমাপ্ত 'অদ্ভুতসাগর' গ্রন্থটি সম্পন্ন করেছিলেন।

ঐতরেয় আরণ্যক (Aitareya Aranyaka) গ্রন্থে 'বঙ্গ' (Banga) নামের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়।

সংক্ষিপ্ত তথ্য:

  • উৎস: এটি ঋগ্বেদের অংশবিশেষ।

  • বর্ণনা: ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে 'বঙ্গ' অঞ্চলের অধিবাসীদের অন্যান্য প্রাক-আর্য উপজাতির (যেমন—বগধ ও চের) সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তৎকালীন অনার্য জনগোষ্ঠীর মানুষকে 'বয়াংসি' বা পাখির মতো অদ্ভুত ভাষায় কথা বলা লোক হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।

  • অন্যান্য উল্লেখ: পরবর্তীতে 'বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ' (যেমন—মিলিন্দপহ্ন), মহাকাব্য (রামায়ণ ও মহাভারত) এবং জৈন গ্রন্থ 'আচারঙ্গ সূত্র'-এ বঙ্গ অঞ্চলের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

আযুক্তমাল্যদা (Amuktamalyada) গ্রন্থটি বিজয়নগর সাম্রাজ্যের তুলুব বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক কৃষ্ণদেব রায় (Krishnadevaraya) তেলুগু ভাষায় রচনা করেন।

সংক্ষিপ্ত তথ্য:

  • রচয়িতা: রাজা কৃষ্ণদেব রায় (নিজে একজন মহাকবি ও সাহিত্য অনুরাগী ছিলেন)।

  • ভাষা: তেলুগু (এটি তেলুগু সাহিত্যের পঞ্চমহাকাব্যের অন্যতম হিসেবে বিবেচিত)।

  • বিষয়বস্তু: এটি মূলত একটি বৈষ্ণব ধর্মভিত্তিক মহাকাব্য। এতে তামিল বৈষ্ণব সাধক (আলভার) পেরিয়ালভার এবং তাঁর কন্যা আন্দাল (যাঁকে 'গোদা দেবী'ও বলা হয়)-এর জীবনকাহিনী এবং ভগবান রঙ্গনাথের (বিষ্ণু) প্রতি তাঁদের ভক্তির বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

  • রাজনৈতিক গুরুত্ব: গ্রন্থটির ৪র্থ পরিচ্ছেদে রাজধর্ম, রাজ্য পরিচালনা ও প্রশাসনিক নীতি (Rajaniti) সম্পর্কে কৃষ্ণদেব রায়ের নিজস্ব দূরদর্শী মতামত অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণিত হয়েছে।

সঠিক উত্তরটি হলো এ) বৃন্দাবন দাস।

সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

  • গ্রন্থের পরিচয়: 'চৈতন্যভাগবত' হলো বাংলা ভাষায় রচিত শ্রীচৈতন্যদেবের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও প্রামাণিক জীবনীগ্রন্থ।

  • রচয়িতা: বৃন্দাবন দাস (Brindaban Das)। তিনি বৈষ্ণব সমাজে 'চৈতন্যলীলার ব্যাস' বা 'বাংলা সাহিত্যের ব্যাসদেব' নামে পরিচিত।

  • অন্যান্য বিকল্পগুলির পরিচিতি:

    • কৃষ্ণদাস কবিরাজ: তিনি বাংলা ভাষায় রচিত চৈতন্যদেবের সবচেয়ে দার্শনিক ও প্রখ্যাত জীবনীগ্রন্থ 'চৈতন্যচরিতামৃত' রচনা করেন।

    • লোচন দাস: তিনি চৈতন্যদেবের অপর একটি জনপ্রিয় বাংলা জীবনীগ্রন্থ 'চৈতন্যমঙ্গল' রচনা করেন।

    • হোসেন শাহ: বাংলা সালতানাতের বিখ্যাত স্বাধীন সুলতান (আলাউদ্দিন হোসেন শাহ), যিনি শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক ছিলেন এবং বৈষ্ণব সাহিত্যের বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন।

সঠিক উত্তরটি হলো সি) আবদুল কাদির বাদাউনী।

সংক্ষিপ্ত বিবরণ:

  • গ্রন্থের পরিচয়: 'মুনতাখাব-উত-তাওয়ারিখ' (Muntakhab-ut-Tawarikh) বা 'তারিখ-ই-বাদাউনী' হলো ফারসি ভাষায় রচিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থ।

  • বিষয়বস্তু: এতে গজনীর সুলতান সুবুক্তগীনের সময় থেকে শুরু করে মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালের ৪০তম বছর (১৫৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে।

  • বিশেষত্ব: বাদাউনী ছিলেন সম্রাট আকবরের রাজসভার একজন পণ্ডিত, তবে তিনি আকবরের উদার ধর্মীয় নীতি (দীন-ই-ইলাহী) এবং আবুল ফজলের দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচক ছিলেন। তাই আকবরের নীতির এক নিরপেক্ষ ও সমালোচনামূলক চিত্র এই গ্রন্থে পাওয়া যায়।

অন্যান্য বিকল্পগুলির পরিচিতি:

  • ইবন বতুতা: মরক্কোর এই বিখ্যাত পর্যটক তাঁর সফরনামা 'আল রিহলা' (Al Rihla) গ্রন্থটি রচনা করেন।

  • আবুল ফজল: সম্রাট আকবরের সুহৃদ ও রাজকীয় ঐতিহাসিক; তিনি 'আকবরনামা' এবং 'আইন-ই-আকবরী' রচনা করেন।

  • আমির খসরু: সুলতানি আমলের বিখ্যাত ফারসি কবি; তিনি 'কিরান-উস-সাদাইন', 'খাজাইন-উল-ফুতুহ', 'তুঘলকনামা' ইত্যাদি বহু গ্রন্থ রচনা করেন।

 


মন্তব্যসমূহ

Click here to view my others posts

DSE-3, 2023, History Honours 6th Semester Question paper of CBPBU University

B.A. History Honours 6th Semester , Core Course-13, 2023, CoochBehar Panchanan Barma University, Question Paper 📃

ভারতীয় মধ্যযুগের ইতিহাস

4th semester